শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ৩০ বছরের পুরনো সাক্ষাৎকার

গত ৮ মার্চ ১৯৯৫ কথা সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে জলপাইগুড়ি সৎসঙ্গ বিহারে এসেছিলেন। ওইদিন অনুষ্ঠানের এক ফাঁকে লেখকের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শরৎচন্দ্র, নীরদ চৌধুরি, জ্যোতিষ, বর্ণাশ্রম প্রথা, ভূত, বিজ্ঞান এবং তসলিমা নাসরিন প্রসঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত মতামত জানা যায়। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন পিনাকী রঞ্জন পাল। লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ওই বছরের ২৫ মার্চ দৈনিক বসুমতি সংবাদপত্রে। সাক্ষাৎকারটি নীচে হুবহু তুলে দিলাম।

প্রশ্ন: উঃ বঙ্গ স্মৃতি নিয়ে কিছু বলুন?

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়- আমার বাবা রেলে চাকরি করতেন। চাকরি সূত্রে বাবাকে উঃ বঙ্গের বহু জায়গায় থাকতে হয়েছে। বাবার সঙ্গে আমাদেরও সেখানে যেতে হয়েছে। এই জলপাইগুড়িতেও আমরা ছিলাম। এখানকার ফণীন্দ্রদেব বিদ্যালয়ে আমি পড়াশোনা করেছি। আমার বৃদ্ধ বাবা এখনও শিলিগুড়িতে থাকেন। কেবল আমিই আমার পরিবারটুকু নিয়ে কলকাতায় থাকি। তাই উঃ বঙ্গে এলে আমি ঘরে ফেরার সুখ অনুভব করি।

প্রশ্ন: আপনার মা-বাবা কি চাইতেন আপনি লেখালিখির জগতে আসুন?

শীর্ষেন্দু: না। বাবা চাইতেন আমি এমএ পাস করে অধ্যাপক হই। কিন্তু আমি তা বিসর্জন দিয়েছিলাম। আমি আমার কেরিয়ার বিসর্জন দিয়ে সাহিত্যকে আঁকড়ে ধরেছিলাম।

প্রশ্ন: বেশির ভাগ লেখকই প্রধান লেখাগুলি শেষ করেন তাঁদের লেখক জীবনের প্রথম পর্বে। তারপর যেন তাঁরা চবির্ত চর্বন করেন। ক্বচিৎ দু চারজনের জীবেন দ্বিতীয় জোয়ার দেখা দেয়। দিলে তা লেখককে শ্রেষ্ঠতর লেখকে পরিণত করে?

শীর্ষেন্দু: হ্যাঁ, সবার ক্ষেত্রে এটা হয় কিনা জানি না, তবে প্রথম দিকে একটা লাইন লেখার জন্য যে পরিশ্রম করেছি, এই বয়সে এখন আর সেটা সম্ভব নয়। প্রথম দিকে একটা একরোখা ইগো মনোভাব ছিল। প্রচণ্ড পরিশ্রমের ফলে শরীর ভেঙে পড়েছিল, আলসার হয়েছিল। সব সময় মনে হত আমার একটা নিজস্ব স্টাইল তৈরি করতে হবে। যাতে পাঠক লেখা পড়েই বুঝতে পারে লেখাটা কার।

প্রশ্ন: বাংলা গল্প উপন্যাসের ক্ষেত্রে নতুন লেখক আগের মত উঠে আসছেন না, এর কারণ কি?

শীর্ষেন্দু: এটা বোধহয় পুরোপুরি ঠিক নয়। তবে হ্যাঁ, আগে যেরকম পুরানরা ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে একদল নতুন লেখক এসে সব’ তছনছ করে দিত, গত দু’দশক ধরে এরকম হচ্ছে না। তবে নতুনরা চেষ্টা করছে। ‘দেশ’ পত্রিকাও সব সময় নতুনদের কাছ থেকে ভাল লেখা পেলেই ছাপছে। তাকে আরও লেখা পাঠাতে বলা হচ্ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে নতুনদের প্রথম লেখা ভাল হলেও পরবর্তীতে আর তাদের কাছ থেকে ভাল লেখা পাওয়া যায় না।

প্রশ্ন: উঃ বঙ্গের সাহিত্যচর্চার মান সম্পর্কে আপনার মতামত।

শীর্ষেন্দু: সাহিত্যের ক্ষেত্রে উঃ বঙ্গ দঃ বঙ্গ বলে আলাদা কিছু নেই। আর এখানকার সাহিত্যে উন্নতিটা ধরা যায় না কারণ, এখানকার লেখকরা উন্নতি হলেই কলকাতায় চলে যান। দেবেশ রায়, সমরেশ মজুমদার, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, অমিয়ভূষণ মজুমদার এঁরা তো উঃ বঙ্গেরই লেখক। তাই উঃ বঙ্গ প্রতিভাশূন্য হয়েছে বলা যায় না।

প্রশ্ন: জলপাইগুড়ির সাহিত্যচর্চার মান সম্পর্কে আপনার মত।

শীর্ষেন্দু: উঃ বঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়ির মধ্যে হয় জলপাইগুড়িই অগ্রণী। এখানকার ছেলেরা বিশ্ব সাহিত্যের এমন খবরও রাখে, যেগুলো আমরাও জানি না।

প্রশ্ন: লিটল ম্যাগাজিন সম্পর্কে আপনার বক্তব্য।

শীর্ষেন্দু: এগুলো একসময় খুবই ভাল ছিল। কিন্তু এখন আর তেমন হচ্ছে না। খুব চাঁছাছোলা ভাষায় লিখতে হবে। না হলে লিটল ম্যাগাজিন করে কি হবে।

প্রশ্ন: ভিডিও, দূরদর্শন কি সাহিত্যের পাঠক সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে না?

শীর্ষেন্দু: পড়া আর দেখার মধ্যে তফাত আছে। দুটো আলাদা মাধ্যম। তাই এদের জন্য সাহিত্যের কোন ক্ষতি হচ্ছে বলে মনে করি না।

প্রশ্ন: পাঠকরা অভিযোগ করে থাকেন বর্তমানের শারদীয়া সংখ্যাগুলোতে নামী লেখকদের মান অনুযায়ী লেখা পাওয়া যাচ্ছে না।

শীর্ষেন্দু: এখন সাহিত্যে একটু ক্লান্ত লেখক লিখছেন। আমাদের সমসাময়িক লেখকরা অনেকটা ঢলে পড়েছে। গত বছর থেকে আমাকে পুজোতে প্রায় চারটি উপন্যাস লিখতে হচ্ছে। ফলে নার্ভের ওপর ‘প্রচণ্ড চাপ পড়ছে। এটা কমার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু হচ্ছে না।

প্রশ্ন: নতুন লেখা লিখতে কেমন লাগে? সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছেন কোন্ লেখা লিখে?

শীর্ষেন্দু: লেখা লিখতে বোধহয় এখন আর ভাল লাগে না। আর সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছিলাম ‘উজান’ লিখে।

প্রশ্ন: শুধু লেখার ওপর নির্ভর করে অ জীবিকা অর্জন সম্ভব কি?

শীর্ষেন্দু: বহু কষ্ট। বাঁচা সম্ভবও নয়। পশ্চিম বাংলায় খুম কম লেখকই আছেন, যাঁরা লেখার মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করে থাকেন।

প্রশ্ন: আপনি বিজ্ঞান ও ভূত উভয় বিষয়েই লিখে থাকেন। আপনি কি ভূত বিশ্বাস করেন?

শীর্ষেন্দু: বিজ্ঞান কিন্তু বলেনি যে, ভূত নেই। আমরা বিজ্ঞানকে যেমন মানি, তেমনই ভূতকেও অবিশ্বাস করি না। তাই নয় কি?

প্রশ্ন: পাঠক হিসাবে আপনার প্রিয় লেখক কে?

শীর্ষেন্দু: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। শরৎচন্দ্র মস্ত লেখক মানুষ ছিলেন। তাঁর মধ্যে এমন বারুদ ঠাসা ছিল, যা লিখলে তিনি বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে টেক্কা দিতে পারতেন। কিন্তু তা তিনি করেননি। এছাড়াও আমার সমসাময়িক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, দিব্যেন্দু পালিত এদের লেখাও আমার ভাল লাগে।

প্রশ্ন: জ্যোতিষে বিশ্বাস করেন?

শীর্ষেন্দু: সম্পূর্ণভাবে অবিশ্বাস করি না। আবার হাত দেখা বা কোষ্ঠী দেখে বিচার মানি না।

প্রশ্ন: আপনার লেখায় অসবর্ণ বিয়ে কেন?

শীর্ষেন্দু: অসবর্ণ বিয়ে বা প্রেম ঘটাই না কেননা, আমি বিশ্বাস করি যে, বর্ণাশ্রম প্রথা ভাঙাটা উচিত নয়।

প্রশ্ন: আপনার সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস ‘পার্থিবে’র অন্যতম চরিত্র ‘আপা’র মাধ্যমে আপনি বলেছেন বাংলায় ইংরাজি শব্দ পরিহারের কথা। অথচ ‘পার্থিব’ ও ‘সাদা বেড়াল কালো বেড়াল’ লেখায় আমরা বহু ইংরেজি সমাহার পেয়েছি।

শীর্ষেন্দু: আমি ইংরেজি ব্যবহার করি সংলাপে। বাস্তবে কথা বলতে গিয়ে আমরা অনেক ইংরেজি বলে থাকি। তাই যাতে সংলাপে কৃত্রিমতা না আসে সে জন্যই ইংরেজি ব্যবহার করি। তা ছাড়া আজ আর ইংরেজিকে অদ্ভুত করে রাখলে চলবে না।

প্রশ্ন: তসলিমা নাসরিন সম্পর্কে আপনার মত?

শীর্ষেন্দু: তসলিমা আমার মেয়ের মত। ও খুব নরম প্রকৃতির মেয়ে। আমার মতে, তসলিমা সাহিত্যিক হিসাবে এখনও অপরিণত। আনন্দবাজার ওকে প্রথম তুলে ধরে। তবে এতখানি যাওয়ার ক্ষমতা ওর ছিল না। ওর জীবনযাপন পদ্ধদ্ধতিও খুবই ও অস্বস্তিকর। ওর বক্তব্যগুলি ‘বিবাহ তুলে দাও’ প্রভৃতিতে বড়ই যুক্তির অভাব। ও নিজেকে পুরুষ-বিদ্বেষী হিসাবে জাহিরের চেষ্টা করছে। একজন লেখিকা নয়, নারীবাদী হিসাবেই ওকে সর্বত্র ডাকা হচ্ছে।

প্রশ্ন: নীরদ চৌধুরির লেখা সম্পর্কে আপনার মত?

শীর্ষেন্দু: নীরদবাবুকে আমি কখনই সিরিয়াসভাবে নেই না। তবে তাঁর লেখাগুলি পড়ে বেশ মজা পাই।

প্রশ্ন: নবীনদের প্রতি আপনার উপদেশ?

শীর্ষেন্দু: সাহিত্যের কোন ভৌগোলিক সীমানা নেই। বর্তমানে বিশ্ব সাহিত্যের মাপদণ্ডে বাংলা সাহিত্যকে বিচার করা হচ্ছে। তাই আর এদিক-সেদিক থেকে চুরি করে লেখার সুযোগ নেই। প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হবে। মানুষকে ভালভাবে চিনতে হবে, বুঝতে হবে-তবেই সে কলম ধরার অধিকারটুকু পাবে। নয়ত লেখা হবে, কিছু ছাপাও হবে, কিন্তু টিকে থাকবে না। লেখার একটা নিজস্বতা তৈরি করতে হবে। যার নিজস্বতা আছে সে অবশ্যই টিকে থাকবে। সবচেয়ে পরিশ্রমের কাজ যদি থাকে তবে তা হল লেখা। মনে রাখতে হবে সমগ্র পৃথিবীর সমস্ত লেখকই আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী।

শেষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *